প্রচ্ছদ > খেলা > ফুটবল

একটি যুগের বিদায়, আরেকটি যুগের জন্ম

article-img

বিশ্বকাপ শুধু ট্রফি জয়ের লড়াই নয়, সময়ের সবচেয়ে নির্মম আয়না। একটি দল চ্যাম্পিয়ন হয় না, একটি প্রজন্মের উত্থান হয়, আরেকটি প্রজন্ম নীরবে বিদায় নেয়। সবুজ ঘাসের ওপর গড়িয়ে চলা বল কখন যে ফুটবলের ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায় লিখে ফেলে, তা কেউ আগে থেকে জানে না।

প্রতি চার বছর পরপর পৃথিবী থমকে দাঁড়ায়। কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনের সামনে বসে থাকেন, স্টেডিয়ামের গ্যালারি রঙিন পতাকায় ঢেকে যায়, জাতীয় সংগীতের সময় খেলোয়াড়দের চোখ ভিজে ওঠে।

একদিন দিয়েগো ম্যারাডোনা বিদায় নিয়েছিলেন, তারপর জিনেদিন জিদান, রোনালদো নাজারিও, রোনালদিনিও, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, জাভি, ফিলিপ লাম, ওয়েইন রুনি , লুকা মদরিচদের প্রজন্ম ধীরে ধীরে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে। ফুটবল কখনো শূন্য থাকে না। একজন কিংবদন্তি মঞ্চ ছাড়লে, আরেকজন সেই আলো নিজের করে নেন।

লিওনেল মেসির বাঁ পায়ের জাদু দুই দশক ধরে পৃথিবীকে মুগ্ধ করেছে। প্রতিটি স্পর্শ, পাস, ড্রিবল ফুটবলের ভাষাকে নতুন করে লিখেছে। মেসি মাঠে নামলে গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে মানুষ মোবাইলের আলো জ্বালায়।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো অদম্য পরিশ্রম, অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রতীক। বয়স তাকে ধীর করলেও স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারেনি।

কেভিন ডি ব্রুইনের এই বিশ্বকাপ অন্যরকম। বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্ম বছরের পর বছর ফুটবলকে সৌন্দর্য উপহার দিয়েছে। বিশ্বকাপের ট্রফি তাদের হাতে ওঠেনি। সময়ের নিয়ম বড় নিষ্ঠুর। যে হাত একদিন বিশ্ব ফুটবল শাসন করেছে, একসময় সেই হাতই ধীরে ধীরে রাজদণ্ড ছেড়ে দেয়। কোনো বিদায় অনুষ্ঠান হয় না। শেষ বাঁশি বাজে, মানুষ বুঝতে পারে একটি যুগ শেষ হয়ে গেল। ফুটবলে শূন্যতা কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। যখন বিদায়ের সুর বাজে, জন্ম নেয় নতুন সিম্ফনি।

লামিন ইয়ামাল ভয় শব্দটি চিনেই না। বয়স তার কম, সাহস অনেক বড়। বিশ্বকাপের আলো, লাখো দর্শক, কোটি মানুষের প্রত্যাশা তাকে বিচলিত করে না। এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা ইতিহাসকে অনুসরণ করতে নয়, নতুন ইতিহাস লিখতে মাঠে নামে।

কিলিয়ান এমবাপ্পে ভবিষ্যত নয়, বর্তমানও তার। গতি, দক্ষতা তাকে আরও বড় কিংবদন্তি হওয়ার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। জুড বেলিংহ্যামের ফুটবলে আছে নেতৃত্বের পরিপক্বতা, যা তার বয়সকে ভুলিয়ে দেয়। মধ্যমাঠে তার নৈপুণ্য পুরো দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়।

আর্লিং হালান্ড গোলকে অভ্যাসে পরিণত করেছেন। ব্রাজিলের মতো পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে হারিয়ে নরওয়ে নতুন ইতিহাস লিখেছে। জন্ম নিয়েছে নতুন এক বিশ্বাস। ফুটবলের মানচিত্র বদলাচ্ছে।

উসমান দেম্বেলের প্রতিভা পরিণতির সঙ্গে মিলিত হয়ে ভয়ংকর হয়ে উঠেছেন। তার গতি, সৃজনশীলতা আর অপ্রত্যাশিত মুহূর্ত তৈরি করার ক্ষমতা আধুনিক ফুটবলের নতুন রূপক।

১৯৫৮ সালে এক কিশোর পেলের জন্ম হয়েছিল বিশ্বমঞ্চে। ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ হয়ে উঠেছিল ম্যারাডোনার। ১৯৯৮ সালে বিশ্ব দেখেছিল তরুণ থিয়েরি অঁরির আগমন। ২০০৬ ছিল জিদানের বিদায়ের গল্প। ২০১০ স্পেনের টিকিটাকার রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। ২০১৪ সালে জার্মানি নতুন শক্তির পরিচয় দিয়েছিল। ২০১৮ সালে এমবাপ্পে জানিয়ে দিয়েছিলেন, ভবিষ্যতের দরজা খুলে গেছে। ২০২২ সালে মেসি নিজের অসমাপ্ত গল্প পূর্ণ করেছিলেন। এই বিশ্বকাপ হয়তো সেই অধ্যায়, যেখানে নতুন সম্রাটদের অভিষেক ঘটছে।

ফুটবল কখনো একজন মানুষের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। একটি প্রজন্ম বিদায় নেয়, আরেকটি প্রজন্ম সেই শূন্যতা পূরণ করে।

গ্যালারিতে বসে থাকা এক শিশু আজ ইয়ামালের জার্সি পরে চিৎকার করছে। কয়েক বছর আগে সেই শিশুর বড় ভাই একই আবেগে মেসির নাম লিখেছিল নিজের গায়ে। সময় বদলায়, নায়ক বদলায়, কিন্তু ভালোবাসা বদলায় না। হয়তো কয়েক বছর পর ইয়ামাল, এমবাপ্পে, বেলিংহ্যাম, হালান্ড কিংবা দেম্বেলেরাও একদিন এই মঞ্চে শেষবারের মতো হাঁটবেন। গ্যালারিতে বসে থাকবে নতুন আরেক প্রজন্ম, যারা তাদের বিদায় দেখবে, আবার নতুন কারও আগমনকে স্বাগত জানাবে।

শেষ বাঁশি বাজে। কেউ বিদায় নিচ্ছেন, কেউ ইতিহাসের দরজায় প্রথম কড়া নাড়ছেন।